ঢাকা, শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

আগস্টে রেমিট্যান্স এসেছে ২৯৭ কোটি ডলার

প্রবাসী আয়ে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রয়েছে। সদ্য শেষ হওয়া আগস্ট মাসে দেশে ২৯৬ কোটি ৬৩ লাখ মার্কিন ডলারের রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। আগের বছরের একই মাসে এসেছিল ২৪২ কোটি ১৮ লাখ ৯০ হাজার ডলার। ফলে এক বছরের ব্যবধানে আগস্টে রেমিট্যান্স বেড়েছে প্রায় ৫৪ কোটি ৪৫ লাখ ডলার বা ২২ দশমিক ৫ শতাংশ।


খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রবাসীদের আগ্রহ বৃদ্ধি, ব্যাংকিং সেবার সহজলভ্যতা এবং অর্থ পাঠানোর প্রক্রিয়া সহজ হওয়ায় দেশে প্রবাসী আয় বাড়ছে। একই সঙ্গে হুন্ডি প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ এবং বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে তুলনামূলক স্থিতিশীলতাও বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াতে ভূমিকা রাখছে।বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাস জুলাই ও আগস্টে মোট রেমিট্যান্স এসেছে ৫৮২ কোটি ৫৩ লাখ ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এসেছিল ৪৮৯ কোটি ৯৭ লাখ ৬০ হাজার ডলার। অর্থাৎ দুই মাসে রেমিট্যান্স বেড়েছে প্রায় ৯২ কোটি ৫৬ লাখ ডলার বা ১৮ দশমিক ৯ শতাংশ।বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, আগস্টে রেমিট্যান্স প্রবাহ জুলাইয়ের তুলনাতেও বেড়েছে। জুলাই মাসে দেশে এসেছিল ২৮৫ কোটি ৮৬ লাখ ৮০ হাজার ডলার। আগস্টে এসেছে ২৯৬ কোটি ৬৩ লাখ ডলার। ফলে এক মাসের ব্যবধানে প্রবাসী আয় বেড়েছে প্রায় ১০ কোটি ৭৭ লাখ ডলার বা ৩ দশমিক ৮ শতাংশ।


ব্যাংকভিত্তিক প্রবাহে শীর্ষে ইসলামী ব্যাংক


আগস্ট মাসে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স এসেছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির মাধ্যমে। ব্যাংকটি এক মাসে ৫৫ কোটি ৮ লাখ ৯০ হাজার ডলার রেমিট্যান্স সংগ্রহ করেছে। জুলাইয়ে ব্যাংকটির মাধ্যমে এসেছিল ৪৫ কোটি ২৭ লাখ ৭০ হাজার ডলার। অর্থাৎ এক মাসে এই ব্যাংকের মাধ্যমে রেমিট্যান্স বেড়েছে প্রায় ৯ কোটি ৮১ লাখ ডলার।রাষ্ট্রীয় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে আগস্টে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স এসেছে অগ্রণী ব্যাংকের মাধ্যমে—১৬ কোটি ২০ লাখ ৮০ হাজার ডলার। এরপর সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমে এসেছে ১৩ কোটি ৯৯ লাখ ১০ হাজার ডলার এবং জনতা ব্যাংকের মাধ্যমে ৭ কোটি ৯৩ লাখ ১০ হাজার ডলার। রাষ্ট্রীয় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মোট রেমিট্যান্স দাঁড়িয়েছে ৪৩ কোটি ৩৪ লাখ ৬০ হাজার ডলার।বিশেষায়িত ব্যাংকের মধ্যে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে আগস্টে এসেছে ২৯ কোটি ১৯ লাখ ১০ হাজার ডলার। বিশেষায়িত দুই ব্যাংক মিলে রেমিট্যান্স এসেছে ২৯ কোটি ১৯ লাখ ১০ হাজার ডলার।ব্যাংকাররা বলছেন, রেমিট্যান্সের এই ইতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকলে বৈদেশিক মুদ্রার জোগান বাড়ার পাশাপাশি রিজার্ভের ওপরও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। আমদানি দায় মেটানো এবং বৈদেশিক লেনদেনে ভারসাম্য রাখার ক্ষেত্রেও বাড়তি রেমিট্যান্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে এই প্রবাহ ধরে রাখতে প্রবাসীদের জন্য ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠানো আরও সহজ, দ্রুত ও প্রতিযোগিতামূলক করা প্রয়োজন।


বেসরকারি ব্যাংকেই ২২৩ কোটি ডলার


বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে আগস্টে রেমিট্যান্স এসেছে ২২৩ কোটি ৪৫ লাখ ৩০ হাজার ডলার। অর্থাৎ দেশের মোট রেমিট্যান্সের বড় অংশই এসেছে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে।বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে ইসলামী ব্যাংকের পর দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক। আগস্টে ব্যাংকটির মাধ্যমে এসেছে ১৫ কোটি ৬৭ লাখ ৫০ হাজার ডলার। এরপর ঢাকা ব্যাংকের মাধ্যমে ১৪ কোটি ৮৪ লাখ ৩০ হাজার, সিটি ব্যাংকের মাধ্যমে ১৩ কোটি ৫২ লাখ ৫০ হাজার, ব্র্যাক ব্যাংকের মাধ্যমে ২৫ কোটি ২৮ লাখ ১০ হাজার এবং ট্রাস্ট ব্যাংকের মাধ্যমে ২১ কোটি ১৪ লাখ ৯০ হাজার ডলার রেমিট্যান্স এসেছে।


ব্র্যাক ব্যাংক এককভাবে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রেমিট্যান্স সংগ্রহ করেছে। আগস্টে ব্যাংকটির মাধ্যমে এসেছে ২৫২.৮১ মিলিয়ন ডলার।এ ছাড়া ইস্টার্ন ব্যাংকের মাধ্যমে ৯ কোটি ১ লাখ ৩০ হাজার, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের মাধ্যমে ৭ কোটি ১৯ লাখ ৩০ হাজার, ইউসিবির মাধ্যমে ৭ কোটি ৪৩ লাখ ৩০ হাজার, সাউথইস্ট ব্যাংকের মাধ্যমে ৬ কোটি ৬০ লাখ এবং পাবালী ব্যাংকের মাধ্যমে ৯ কোটি ৪৯ লাখ ৩০ হাজার ডলার রেমিট্যান্স এসেছে।


বিদেশি ব্যাংকের মাধ্যমে ৬.৭৪ মিলিয়ন ডলার


দেশে কার্যরত বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে আগস্টে রেমিট্যান্স এসেছে ৬৭ লাখ ৪০ হাজার ডলার। এর মধ্যে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের মাধ্যমে এসেছে ৬১ লাখ ৬০ হাজার ডলার। কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলনের মাধ্যমে ২৯ লাখ এবং সিটি ব্যাংক এনএর মাধ্যমে ১৯ লাখ ডলার এসেছে।


দুই মাসেই ৫৮৩ কোটি ডলার


চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই রেমিট্যান্সে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। জুলাইয়ে ২৮৫ কোটি ৮৬ লাখ ৮০ হাজার ডলার এবং আগস্টে ২৯৬ কোটি ৬৩ লাখ ডলার আসায় দুই মাসে মোট রেমিট্যান্স দাঁড়িয়েছে ৫৮২ কোটি ৫৩ লাখ ১০ হাজার ডলার।এর আগের অর্থবছর ২০২৫-২৬-এর আগস্টে রেমিট্যান্স এসেছিল ২৪২ কোটি ১৮ লাখ ৯০ হাজার ডলার। জুলাই ২০২৫-এ এসেছিল ২৪৭ কোটি ৭৮ লাখ ৭০ হাজার ডলার। অর্থাৎ চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেই গত বছরের একই সময়ের তুলনায় রেমিট্যান্স প্রবাহে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে।বাংলাদেশ ব্যাংকের মাসিক তথ্যেও দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আগস্টের পরের মাসগুলোতে রেমিট্যান্স প্রবাহ ২৫০ কোটি ডলারের ওপরে ওঠানামা করেছে এবং মার্চ ২০২৬-এ তা ৩৭৫ কোটি ২২ লাখ ডলারে পৌঁছেছিল। একই অর্থবছরের মোট রেমিট্যান্স ছিল ৩৫ হাজার ৫৮৯.৩৯ মিলিয়ন ডলার।


বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে স্বস্তি


রেমিট্যান্সের এই ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। প্রবাসী আয় ব্যাংকিং চ্যানেলে এলে বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বাড়ে এবং আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক দায় পরিশোধসহ বিভিন্ন বৈদেশিক লেনদেন মেটাতে ব্যাংকগুলোর সক্ষমতা বাড়ে।


বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত সাম্প্রতিক তথ্যেও রেমিট্যান্সকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও বহিঃখাতের স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আগস্টের শেষ দিকেও রেমিট্যান্স প্রবাহের প্রবৃদ্ধি অব্যাহত ছিল।

তবে আগস্টের পুরো মাসের এই ২৯৬ কোটি ৬৩ লাখ ডলারের হিসাবটি বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্ণাঙ্গ মাসিক ব্যাংকভিত্তিক প্রতিবেদনের হিসাব। মাসের শেষ কয়েক দিনের দৈনিক হিসাব প্রকাশের সময়সীমার কারণে বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত ২৬ বা ২৯ আগস্ট পর্যন্ত রেমিট্যান্সের পরিসংখ্যানের সঙ্গে পূর্ণ মাসের হিসাবের পার্থক্য রয়েছে। ২৯ আগস্ট পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্যে ২৬৬ কোটি ৯০ লাখ ডলার এবং জুলাই থেকে ২৯ আগস্ট পর্যন্ত ৫৫২ কোটি ৭০ লাখ ডলারের রেমিট্যান্সের কথা জানানো হয়েছিল।


সব মিলিয়ে চলতি অর্থবছরের শুরুতে রেমিট্যান্সের শক্তিশালী প্রবাহ দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। বিশেষ করে রপ্তানি আয় ও বৈদেশিক লেনদেনের ওপর চাপের মধ্যে প্রবাসী আয় বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সামনে এই প্রবাহ ধরে রাখা গেলে বৈদেশিক মুদ্রাবাজার ও সামগ্রিক বহিঃখাতের ওপর চাপ কিছুটা কমতে পারে।


অর্থনীতিবিদরা বলছেন,‘রেমিট্যান্সের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়াতে, বিনিময় হারের ওপর চাপ কমাতে এবং বহিঃখাতের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।’ তিনি বলেন, রেমিট্যান্স প্রবাহে টেকসই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পারলে বৈদেশিক লেনদেনে চাপ কমবে এবং অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা বাড়বে।

ads
ads
ads

Our Facebook Page